ইসরাইলী গোয়েন্দা সংস্থা মোসাদ কিভাবে কাজ করে | মোসাদ কিভাবে কাজ করে | মোসাদ কি/কী | মোসাদ কোন দেশের | মোসাদ কারা তৈরি করেছে

 
ইসরাইলী গোয়েন্দা সংস্থা মোসাদ কিভাবে কাজ করে | মোসাদ কিভাবে কাজ করে | মোসাদ কি/কী | মোসাদ কোন দেশের | মোসাদ কারা তৈরি করেছে

ইসরাইলী গোয়েন্দা সংস্থা মোসাদ কিভাবে কাজ করে


২০১৯ সালে একজন ফ্রেঞ্চ সাংবাদিকের সাক্ষাৎকার পড়েছিলাম আবুধাবি থেকে প্রকাশিত টাইম আউট (Time Out) ম্যাগাজিনে। সাংবাদিক লোকটির নাম মনে নেই, তাই ধরে নেই তার নাম ডেভিড।


ডেভিড বলেছিল- আমেরিকায় বিশ্ববিদ্যালয়ে  পড়াশোনা করার সময় আমার একজন সহপাঠী বন্ধু ছিল হানান, সে এসেছিল দখলদার ইসরাইল থেকে।

দীর্ঘ প্রায় দুই দশক পরে ফ্রান্সের রেন্নেস শহরে হঠাৎ তার সাথে আমার দেখা। সে আমাকে না চেনার ভান করে কেটে পরতে চেয়েছিল কিন্তু আমি তাকে আগলে ধরি। সে ছিল আমার অন্যতম ঘনিষ্ঠ একজন বন্ধু এবং ভালো বন্ধু। এখানে তাকে একজন সামান্য সবজি বিক্রেতা হিসেবে দেখি, যেটা আমি কোন ভাবেই মেনে নিতে পারছিলাম না। কারণ সে ছিল গণযোগাযোগ  (mass communication) বিষয়ে পড়ুয়া একজন তুখোড় ছাত্র।


আমি তার সাথে কথা বলি এবং জানতে পারি সে শহরের বাইরে সপরিবারে বসবাস করে এবং লিজ নেওয়া কৃষি জমিতে নিজেই সবজি ফলায় এবং শহরে তার নিজের দোকানে বিক্রি করে। শহরের অনেক নামি-দামি ব্যক্তির বাড়িতে অর্গানিক (বিষ মুক্ত) সবজি সরবরাহ করে থাকে। আমি রেন্নেস শহরে গেলে তার সবজি খামারে যেতাম এবং তার সাথে গল্প করতাম। সে চমৎকার ভাবে ফ্রেঞ্চ ভাষায় কথা বলতো, একেবারে স্থানীয় ফ্রেঞ্চদের আঞ্চলিক ভাষা, ফলে মনেই হতোনা যে একজন বিদেশি!


একবার রেন্নেস-এ বেড়াতে গিয়ে দেখলাম তার সবজির দোকান হাত বদল হয়েছে, তার কৃষি খামারে গেলাম, সেখানে জানানো হল সে বছর দুয়েক হলো সপরিবারে নিরুদ্দেশ হয়েছে তার কোন খবর নেই! 


তার সাথে পাঁচ বছর পর আবার যোগাযোগ হলো, তাকে খুঁজে পেলাম ফেইসবুকের মাধ্যমে, টেলিফোনেও কথা হয়। সে এখন তেল আবিব শহরে বসবাস করে, অবসর প্রাপ্ত মোসাদ কর্মকর্তা!

কথাটা শুনে বিশ্বাস করতে কষ্ট হলো, বললাম তুমি কি তাহলে ফ্রান্সে মোসাদের কোন মিশনে ছিলে?

ঃ হ্যাঁ, একজন কলম্বিয়ান ড্রাগ মাফিয়া যিনি ইতালিয়ান নাগরিকত্ব নিয়ে ফ্রান্সে বসবাস করতো তাকে ডাউন করতে (মেরে ফেলতে) আমার মিশন ছিল ফ্রান্সে।

ডেভিড ঃ  তুমি তো ভালো ফ্রেঞ্চ বলতে পার!

ঃ হ্যাঁ, আমি ফ্রান্সের বিভিন্ন শহরে দশ বছর কাটিয়েছি। পাঁচ বছর রেন্নেস এ। যখন নিশ্চিত হলাম ড্রাগ মাফিয়া মোরালেস লোকটি রেন্নেস শহরে নিজস্ব এপার্টমেন্ট কিনে স্থায়ীভাবে বসবাস করছে। আমি অনেক চেষ্টায় তার বাসায় অর্গানিক সবজি ও ফল সরবরাহ করার কাজ নেই। এই কাজটি পেতে আমার অনেক অনেক কাঠখড় পোড়াতে হয়েছিল। সে এখানে বসেই কলম্বিয়ায় শীর্ষস্থানীয় কোকেন ব্যবসায়ীদের নিয়ন্ত্রণ করতো....! আমার উপর এই কাজটির (তাকে শেষ করার) দায়িত্ব পরে। সে খুব ঘন ঘন আবাসন পরিবর্তন করতো, দুই মাস- তিন মাস পরপর এলাকা এমনকি শহর পরিবর্তন করতো। আমরা একসময় নিশ্চিত হলাম সে এই শহরে নিজস্ব এপার্টমেন্ট কিনেছে এবং মাঝে মাঝে এখানে পরিবারের সাথে রাত্রিযাপন করে থাকে।

এটা ছিল মূলতঃ কলম্বিয়ান প্রজেক্ট। তবে ইসরাইলের স্বার্থ জড়িত ছিল। দশ বছরের সমস্ত খরচ মোসাদ বহন করেছে। আমাদের কাছে প্রমাণ ছিল যে সে মধ্য প্রাচ্যের ড্রাগ মাফিয়াদের সাথে ঘনিষ্ঠতা রাখে এবং তার বাহিনীই মধ্যপ্রাচ্যের দায়িত্বে আছে। সে ইসরাইল ভ্রমণ করেছিল কয়েকবার। 


একদিন ব্যবসায়ীদের কালচারাল পার্টির একটি অনুষ্ঠানে তার (ড্রাগ মাফিয়ার) স্ত্রী এবং সন্তানদের দাওয়াত দেই। যেহেতু তারা ছিল আমার সবজি ও ফলের পাকা গ্রাহক, অনেক অনুরোধের পর তারা রাজি হয়। পার্টিতে তার স্ত্রী সন্তানদের বিভিন্ন রাইডে চড়িয়ে এবং ডিনারে যথেষ্ট সন্মানের সাথে আপ্যায়ন করা হয়। সেই রাতেই মাফিয়া সম্রাট মোরালেসকে তার এপার্টমেন্টে বিষাক্ত ছুরি মেরে হত্যা করা হয় এবং তার বাসায় সবকিছু তসনস করে তার বিভিন্ন নথিপত্র নিয়ে নেই। ফ্রেঞ্চ পুলিশ সেটাকে 'চুরির জন্য হত্যা' মামলা বলে নথিভুক্ত করেছিল। (সংক্ষেপিত)


ম্যাগাজিনটি আল আইনের লুলু সুপারমার্কেট থেকে ফ্রি  নিয়েছিলাম, ঘটনাটি বা বিষয়টি আজকে মনে করার কারণ হলো- ২০২০ সালের ২৭ নভেম্বর ইরানের একজন শীর্ষস্থানীয় পরমাণু বিজ্ঞানী মোহসীন ফখরজাদেহ্ আততায়ীর গুলিতে নিহত হন। তিনি ছিলেন ইরানের নাতাঞ্জ পারমাণবিক প্রকল্পের প্রধান বিজ্ঞানী। তার হত্যার পর ইরান কয়েকদিন চুপ ছিল এবং কিছুদিন পর বলেছিল যে এটা দখলদার ইসরাইলের কাজ এবং এর পিছনে স্থানীয় 'বেঈমানরা' সম্পৃক্ত আছে।

কিছুদিন পর ইরানী প্রশাসন একজন ইরানিকে গ্রেফতার করে এবং মোসাদ কে সহযোগিতার প্রমাণ পাওয়ায় তার মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করে।


ফখরজাদেহ্ কে হত্যার খবর শুনে আমি একটি ফেইসবুক পোস্ট করেছিলাম, আমার কাছে মনে হয়েছিল যে এই হত্যাকান্ডটি মোসাদ ই ঘটিয়েছে। এর কারণ হলো- ইরানের পারমাণবিক প্রকল্পে গোয়েন্দাগিরি করার ক্ষমতা, মানসিকতা এবং প্রয়োজনীয়তা আছে কেবল দুটি দেশের- একটি আমেরিকা এবং অন্যটি দখলদার ইসরাইল।


ইরানের সেই শঙ্কা/ধারণা (আমার ধারণাও বটে) আজকে বাস্তব প্রমাণিত হল।

কিভাবে?

সেটা হলো, গতকালের দ্যা গার্ডিয়ান এবং বিবিসি'র অনলাইন সংবাদপত্রে দেখলাম মোসাদ (Mossad) এর একজন অবসরপ্রাপ্ত উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা ইয়োচ্ছি কোহেন (Yossi Cohen) যিনি পাঁচ বছর এই গোয়েন্দা সংস্থাটির প্রধান ছিলেন, তিনি সম্প্রতি Channel 12 টেলিভিশনের সাংবাদিক ইলানা ডায়ান (Ilana Dayan) এর সাথে এক সাক্ষাৎকারে খোলামেলা ভাবে ইরানে হামলার দায় স্বীকার করেছেন।


তিনি বলেন- ইরানের পারমাণবিক প্রকল্প কেন্দ্রের আর্কাইভ থেকে হাজার হাজার গোপন নথিপত্র তারা চুরি করে ইসরাইলে নিয়ে যেতে সক্ষম হয়েছে। অবশ্য এ কাজে একজন ইসরাইলীও অংশ নেয়নি, ২০ জন ইরানি এজেন্ট তাদেরকে এই চুরির কাজে সহায়তা করেছে। আর এই চুরির কার্যক্রম তারা ইসরাইলে মোসাদের সদর দফতরে বসে 'লাইভ' দেখেছে।

চুরি করা এসব দলিলের মূলকপি ২০১৮ সালে প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহু সংবাদ সন্মেলনে প্রদর্শন করেন।


মোহসীন ফখরজাদেহ্কে রিমোট কন্ট্রোলড বোমা মেরে হত্যার দায়ও তিনি স্বীকার করেন। তিনি বলেন এই কাজটির পরিকল্পনা করতে আমাদের  ঠিক দুই বছর সময় লেগেছে!


সাক্ষাৎকারের একপর্যায়ে মিস্টার কোহেন বলেন- মোসাদ- এর চাকুরি জীবনে বিশ্বের বিভিন্ন দেশ ঘুরতে আমি কয়েক'শ পাসপোর্ট ব্যবহার করেছি।


...... তাহলে এবার ভাবুন, মোসাদের কার্যক্রম কেমন? আর কেমন-ই বা তাদের খরচ মেধা কৌশল আর ধৈর্য্য! 


২০২১ সালে মোসাদ- এর বাজেট কতো জানেন?

মাত্র তিন বিলিয়ন ডলার! মানে ৩০০ কোটি ডলার বা প্রায় ২৬০০০ কোটি টাকা মাত্র! 


ধন্যবাদ 

মাসুদ আলম

Tag:ইসরাইলী গোয়েন্দা সংস্থা মোসাদ কিভাবে কাজ করে, মোসাদ কিভাবে কাজ করে, মোসাদ কি/কী, মোসাদ কোন দেশের, মোসাদ কারা তৈরি করেছে 

0/Post a Comment/Comments

chrome-extension://oilhmgfpengfpkkliokdbjjhiikehfoo/img/semstorm-32.png