প্রবন্ধ রচনা শহুরে জীবন এবং এ বিষয়ে কিছু প্রশ্ন ও উত্তর - Time Of BD - Education Blog

হ্যাপি নিউ ইয়ার ২০২৩ ভিজিটর বন্ধুরা। দোয়া করি, এই বছরের প্রতিটি মুহুর্ত যেনো সকলের অনেক আনন্দে কাটে।

প্রবন্ধ রচনা শহুরে জীবন এবং এ বিষয়ে কিছু প্রশ্ন ও উত্তর

 

প্রবন্ধ রচনা শহুরে জীবন, শহুরে জীবন প্রবন্ধ রচনা, শহরের জীবন ও গ্রাম্য জীবন রচনা,

    প্রবন্ধ রচনা শহুরে জীবন


    (সংকেত: ভূমিকা; শহর কি; শহুরে জীবনের স্বরূপ; শহুরে জীবনে প্রকৃতি; শহুরে জীবনে অবকাশ; শহুরে জীবনে সুবিধা; শহুরে জীবনে অসুবিধা; উপসংহার।)


    ভূমিকা: ইংরেজিতে একটি প্রবাদ আছে ''God made the Village man made the town'' অর্থাৎ বিধাতা গ্রাম সৃষ্টি করেছে আর মানুষ তৈরি করেছে নগর/শহর। মানুষ আদিম গুহার অন্ধকার থেকে সভ্যতার পথ পরিক্রমায় তৈরি করেছে অগণিত শহর। রাজ্য শাসন, ব্যবসা, শিক্ষাকেন্দ্র এই সকল বিষয়কে কেন্দ্র করে গড়ে উঠত প্রাচীন শহুরে জনপদ। বিজ্ঞানের অগ্রগতি, চাকা এবং বিদ্যুতের আবিষ্কার পৃথিবীর মানচিত্রে নগর গড়ে তোলার ক্ষেত্রে উৎসাহ যুগিয়েছে। রেললাইনের কল্যাণে এক হয়ে গেছে দূর-দূরান্তের বহু শহর। আধুনিকতা আর শিল্পের ছোঁয়ায় শহুরে জীবন পেয়েছে নান্দনিকতা।


    শহুরে জীবন প্রবন্ধ রচনা


    শহর কি: সাধারণত শহর বলতে আমরা বুঝি আধুনিক সভ্যতার সকল উপকরণ সমৃদ্ধ লোকালয়কে। যেখানে শিল্প কারখানা থেকে শুরু করে সব ধরণের নাগরিক ব্যবস্থাপনা রয়েছে। শহরের জীবন যাত্রার মান গ্রামীণ জনপদ থেকে অনেক উন্নত। শহর মানেই উচুঁ দালান-কোঠা, পাকা রাস্তা, যানবাহন আর জীবিকার সন্ধানে ছুটে চলা ব্যস্ত মানুষ। সভ্যতার ইতিহাসের দিকে তাকালে আমরা দেখতে পাই পৃথিবীর প্রাচীন শহর সমুহকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠে বহু সভ্যতা। খ্রিষ্টপূর্ব ৩৬৫০ সালে তুর্কির “গজনিয়াতেপ” ছিল অফিসিয়ালি পৃথিবীর প্রথম প্রতিষ্ঠিত শহর। এছাড়া মিশরের আলেকজান্দ্রিয়া, ফিলিস্তিনের জেরুজালেম, ইরাকের কিরকুক এবং চীনের সাঙজি প্রদেশের জিয়ান রয়েছে পৃথিবীর প্রাচীনতম শহরের মধ্যে। বর্তমানেও যত শহর পৃথিবীজুড়ে রয়েছে তার সবগুলোই আধুনিক এবং উন্নত সব প্রযুক্তি সংবলিত। শহর মানেই সময়ের সর্বোচ্চ প্রযুক্তি এবং উন্নত জীবন যাপনের প্রাণকেন্দ্র।


    শহুরে জীবনের স্বরূপ: অবিরাম ছুটে চলা, সময়ের ব্যস্ত চাকায় জীবনকে পিষে ফেলাই শহুরে জীবনের স্বরূপ। আপন ভূবন গড়ে তোলাকে নিয়েই দিনরাত ব্যস্ত শহরের মানুষ। মানবিক সম্পর্কগুলো শহরের মানচিত্রে জটিল এক সমীকরণ। জীবনের ব্যস্ত গোলক ধাঁধাঁয় পাক খায় মানুষের আবেগ। আর তাই কাউকে দেখা যায় বিলাসী জীবনের ছন্দে আটকে আছে আর কেউবা অযত্নে অবহেলায় মানবেতর জীবন যাপন করছে। শহর যাকে দেয় দু হাত ভরে দেয় আর যাকে দেয় না সে পড়ে থাকে পথের পাশে। শহর যেন অসমতার এক নীরব তটরেখা। এখানে একই আকাশের নিচে কেউ গরীব, কেউ ধনী, কেউ রাজপ্রাসাদে বাস করে আর কেউ ফুটপাতে। রঙিন বিজলী বাতি আর পাকা বাড়ি শহুরে জীবনকে নান্দনিক করে দিলেও কেড়ে নিয়েছে মানুষের আবেগ। শহরের চারদেয়ালে মানুষের জীবন তাই হয়ে গেছে রংহীন আলপনা। ব্যস্ত শহরের দূষিত বাতাসে আটকে পড়া মন তাই ছুটে যেতে চায় দিগন্তের কাছে। সবুজ গ্রামের উপর নীল আকাশ যেখানে ছাদ হয়ে ঝুলে আছে।


    শহরের জীবন ও গ্রাম্য জীবন রচনা


    শহুরে জীবনে প্রকৃতি: প্রকৃতি মানেই গ্রাম, যেখানে অবারিত মাঠে খোলা হাওয়া দোল খায় পাকা ধানের শীষে। গ্রামীণ জনপদ পেরিয়ে শহরের দ্বারপ্রান্তে দাঁড়ালেই মনে হয় প্রকৃতি যেন পিছনে হাটছে। শহরের ব্যস্ততম রাস্তায় বাতাস থমকে যায়। সবুজ মাঠ, অবারিত ফসলের ক্ষেত আর বহতা নদীর বড় অভাব ইট, কাঠের শহরে। ছয় ঋতুর বাংলাদেশ যেন শহরে এসে অর্ধেক হয়ে গেছে। ঋতু বৈচিত্র্য শহরে নেই বললেই চলে। এখানে ঋতুর পালা বদল মানেই বোশেখের তপ্ত রোদে দগ্ধ হওয়া, কিংবা নাগরিক কোলাহল ছাপিয়ে এক পশলা বৃষ্টির শব্দ। শহরে শীত আসে চুপিসারে, স্বল্প সময়ের ব্যবধানে আবার বিদায়ও নেয়। দালানকোঠার আড়ালে হারিয়ে যায় শরতের কাশফুল। হেমন্তের নবান্ন উৎসব এখানে বড্ড বেমানান। ফসলের মাঠ যেখানে নেই সেখানে নবান্ন আসবেই বা কি করে। এই ছুটে চলা যান্ত্রিক জীবনে বাংলার প্রকৃতি, ছয় ঋতুর পালাবদল কোনো কিছুই চোখে পড়ে না। সবার অলক্ষ্যে নগরের কোনো ছোট্ট উদ্যানে ফুটে থাকে বর্ষার কদম ফুল। শহুরে জীবনে প্রকৃতি মানেই সূর্যের উদয়-অস্ত। ব্যস্ত জীবনে এক পশলা বৃষ্টিই সবাইকে প্রকৃতির ছোঁয়া এনে দেয়। শহুরে জীবনে প্রকৃতির উপস্থিতি তাই একদমই টের পাওয়া যায় না।


    শহুরে জীবনে অবকাশ: জীবিকার জন্য যেখানে ছুটে বেড়াতে হয় দিন-রাত সেখানে অবকাশ মানে বিলাসিতা। সারা সপ্তাহ কর্মব্যস্ত থাকার পর একদিনের ছুটি জীবনকে যেন উপহাস করে যায়। শহরের বেশিরভাগ মানুষ তাই ছুটির দিনে বিশ্রাম নিতেই বেশি পছন্দ করে। জীবন যেখানে আবদারের ঝুড়ি মেলে রাখে সেখানে ছোট্ট অবসরটুকুও নানা ব্যস্ততায় কেটে যায়। ছুটির দিনে তাই কেউ কেউ ভীর জমায় শপিং মলে। দৈনন্দিন জীবনের টুকিটাকি প্রয়োজন মেটাতে ছুটতে হয় শপিংয়ে। কেউবা পরিবার পরিজন নিয়ে ঘুরতে যান চিড়িয়াখানা, জাদুঘর, শিশুপার্ক কিংবা উদ্যানে। সৌখিন খাবারপ্রিয় মানুষ ভিড় জমান পছন্দের রেস্তোরায়। কেউবা চলে যান সিনেমা দেখতে কিংবা শিল্পকলায় নাটক উপভোগ করতে। ছুটির দিনে তারুণ্যের আড্ডায় মুখরিত হয় টি,এস,সি, ব্যস্ত শহরে সন্ধ্যা নেমে আসে। স্বল্প পরিসরের অবকাশ শেষে আবার গন্তব্যে ফিরে যায় মানুষ। শুরু হয় কর্মমুখর, ব্যস্ত শহুরে জীবন।


    শহুরে জীবনের সুবিধা: সভ্যতা গড়ে উঠেছিল শহরকেন্দ্রিক হয়ে, আর তাই শহরে সংযোজিত ছিল মানুষের জন্য সর্বোচ্চ সুবিধা। শহরে উন্নত জীবন যাপনের জন্য সব ধরণের সুযোগ সুবিধা রয়েছে। শিক্ষার জন্য রয়েছে নামি দামি সব স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়। চিকিৎসার জন্য শহরে রয়েছে অগণিত হাসপাতাল, ক্লিনিক যা মানুষকে সর্বোচ্চ মানের চিকিৎসা সেবা দিয়ে থাকে। প্রচীনকাল থেকেই ব্যবসার প্রাণকেন্দ্র হিসেবে বিবেচিত শহর। গ্রাম থেকে বহু মানুষ এখনো শহরে আসে জীবিকার সন্ধানে। কর্মব্যস্ততার কারণে মানুষ এখানে ছোট ছোট কাজের জন্য অপরের শরণাপন্ন হচ্ছে। ফলে তৈরি হচ্ছে নতুন নতুন কর্মক্ষেত্র। অফিস, আদালত, কলকারখানাগুলো শহরে অবস্থিত হওয়াতে চাকুরির অন্যতম স্থান হিসেবেও বিবেচিত হয় শহর। গ্রামীণ কৃষির বাজার বলা হয় শহরকে। গ্রাম থেকে কৃষকরা ভালো দামের আশায় তাদের পণ্য নিয়ে আসেন শহরে। শহরে রয়েছে বিদ্যুৎ, যা সভ্যতাকে আলোকিত করেছে। দ্রুত যাতায়াতের জন্য রয়েছে মোটরযান, রেলগাড়ি এবং উড়োজাহাজ। পাকা দালানকোঠা, রাস্তাঘাট এবং রঙ-বেরঙের বিজলী বাতি শহুরে জীবনকে করেছে দৃষ্টিনন্দন। শহরের সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো এখানে হাতের নাগালেই সব কিছু পাওয়া যায়।


    শহুরে জীবনে অসুবিধা: নান্দনিক স্থাপত্য, আকাশচুম্বী সব অট্টালিকা শহরকে একদিকে যেমন দৃষ্টিনন্দন করে তুলেছে অপরদিকে করে তুলেছে বিষাদময়। শহরের কলকারখানার বিষাক্ত ধোঁয়া বাতাসকে করে দিচ্ছে নিশ্বাসের অনুপযোগী, এর বর্জ্য নদীর পানিকে নষ্ট করছে ক্রমান্বয়ে। জনসংখ্যার সাথে সাথে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে যানবাহন। ক্রমবর্ধমান গাড়ির কারণে বেড়ে চলছে যানজট আর শব্দদূষণের মাত্রা। সেই সাথে বাড়ছে দুর্ঘটনা এবং দুর্ঘটনায় মৃত্যুর হার। অনিয়ন্ত্রিত ট্রাফিক ব্যবস্থার কারণে ঘণ্টাব্যাপী আটকে থাকতে হয় রাস্তায়। নিরাপত্তাহীনতা শহুরে জীবনের আরেক বিরূপ দিক। অনবরত ছিনতাই, ডাকাতি এবং খুনের ঘটনা জীবনকে দুর্বিষহ করে তুলে। মাঝে মাঝে লোডশেডিংয়ে শহরের চিত্র বদলে যায়। ঘুটঘুটে অন্ধকারকে তখন মনে হয় বিভীষিকাময় রাত। কর্মব্যস্ততার আড়ালে মানুষের সাথে সম্পর্কগুলো কেমন যেন ঠুনকো মনে হয়। অনেক সুবিধার পাশাপাশি অসুবিধা শহুরে জীবনকে যেন বিষিয়ে তুলে। এইসব নেতিবাচক দিকের প্রভাবে শহুরে মানুষের মনের আবেগ, ভালোবাসা, আন্তরিকতা ক্রমেই অনুভূতিহীন হয়ে পড়ছে।


    উপসংহার: বিশ্বায়নের এই যুগে বিলীন হচ্ছে গ্রাম আর বাড়ছে শহর। জীবনের তাগিদে মানুষ পাড়ি জমাচ্ছে গ্রাম ছেড়ে শহরে। মানুষের শহরমুখী হওয়ার প্রবণতা বাড়াচ্ছে শহরের পরিধি। যান্ত্রিকতায় আটকে যাচ্ছে গ্রামীণ জীবনও। শহর যেমন জেগে থাকে নিশিদিন তেমনি শহরের মানুষও জেগে থাকে নিয়ন আলোর শহরে। অফুরন্ত কাজ আর ব্যস্ততা এই নিয়েই শহরের জীবন । যে জীবনে সম্পর্কগুলোও ইট-পাথরের মতো জড় হয়ে গেছে। তবুও জীবনকে গতিময় করতে, সময়ের সাথে তাল মিলিয়ে চলতে গেলে শহরে আসতে হয়, হতে হয় শহুরে।


    Tag: প্রবন্ধ রচনা শহুরে জীবন, শহুরে জীবন প্রবন্ধ রচনা, শহরের জীবন ও গ্রাম্য জীবন রচনা, 

    Next Post Previous Post
    No Comment
    Add Comment
    comment url